‘সুশীল সমাজ’ সমাচার
॥ ১॥
‘সুশীল সমাজ’ (‘Civil Society')-এর প্রসঙ্গটি আজকাল এদেশের শিক্ষিত মানুষের মুখে মুখে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। তিন-চার দশক আগে কিন্তু ঠিক এ রকমটা ছিল না। তবে একথাও অবশ্য বলা যাবে না যে, ‘সুশীল সমাজ' অভিধাটির ব্যবহার তখনকার দিনে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উঁচু স্তরে লেখাপড়ার সময়ে এবং রাজনৈতিক তত্ত্ব চর্চার প্রয়াসকালে ‘সুশীল সমাজ' প্রসঙ্গটির সাথে কারো কারো কিছুটা পরিচয় হওয়ার সুযোগ ঘটতো। তবে সে সময় তাদের সাথে সেই পরিচয়টি ঘটতো প্রধানত একটি একাডেমিক ও তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে। পরিচয় সীমাবদ্ধ থাকতো মূলতঃ বইয়ের পাতার গণ্ডির মধ্যে। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পৌর বিজ্ঞানসহ কোনো বিষয়ের নির্ধারিত টেক্সট বইয়ের পাতায় ‘সুশীল সমাজ' প্রসঙ্গের কোনো খোঁজ ছিল বলে অন্তত আমার তো মনে পড়ে না। আরো অনেক ওপরের ক্লাসে লেখাপড়া করার সময়ে, কিংবা রাজনৈতিক সাহিত্যের উৎসাহী পাঠক বা গবেষক হিসেবে, দুই একটি পাঠ্য বইয়ে এবং বিশেষত নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাইরের দুষ্প্রাপ্য কিছু বই থেকে, ‘সুশীল সমাজ' প্রসঙ্গের সাথে উৎসাহী কোনো মানুষের পরিচয় হওয়ার সুযোগ ঘটতো।
বাংলাদেশে ‘সুশীল সমাজ' অভিধাটির বহুল ব্যবহার ও প্রয়োগ শুরু হয়েছে তিন দশক আগে, আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে। এখন পত্রিকার কলামে, টিভি'র টক শোতে, সংবাদ প্রতিবেদনে, সেমিনারে, গোলটেবিল আলোচনায়, মানববন্ধনের ঘোষণায়, পাঁচ তারা হোটেলের আলোচনা সভায়, বিশিষ্টজনদের বক্তৃতায়-ভাষণে, পোস্টার-ব্যানার-হোর্ডিংয়ে-প্রায় সর্বত্রই বহুল উচ্চারিত ও ব্যবহৃত একটি প্রসঙ্গ হলো ‘সুশীল সমাজ'। বলা যায় যে, তখন থেকেই বাংলাদেশে ‘সুশীল সমাজ' অভিধাটি ব্যবহারের সাম্প্রতিক ঢলের শুরু। বিশ্বপরিমণ্ডলেও সেই আশির দশক থেকেই ‘সুশীল সমাজ’ প্রসঙ্গটিকে ‘জাতে উঠ'তে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দলিলে ও প্রতিবেদনে, দাতা সংস্থাগুলোর নির্দেশাবলী ও সুপারিশে, গ্লোবাল সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে, নামী-দামী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বিশ্বের পণ্ডিত মহলের গবেষণাপত্র ও থিসিসে 'সুশীল সমাজে'র প্রসঙ্গটিকে পরিণত করা হয়েছে আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয়ে। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতাতেই, এ বিষয়ে উৎসাহের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চেয়ে লক্ষণীয় রূপে অগ্রবর্তী হিসেবে, বাংলাদেশে 'সুশীল সমাজ' অভিধাটির ব্যবহারই শুধু বাড়েনি, ‘সুশীল সমাজ' বলে কথিতরা বাংলাদেশের সমাজ জীবনে একটি শক্তিশালী প্রায়োগিক বাস্তব উপাদান ও শক্তি হয়ে উঠেছে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মহল থেকে অনেক আগেই 'সিভিল সোসাইটি' বা 'সুশীল সমাজ' প্রসঙ্গ নিয়ে একটি গভীর আলোচনার সূত্রপাত করা উচিত ছিল। যতোটা প্রয়োজন, সেই তুলনায় এই প্রয়োজনীয় কাজের সামান্যই করা হয়েছে। অধিকাংশ পণ্ডিত, ভিন্ন ভিন্ন বিবেচনা থেকে হলেও, ‘'সুশীল সমাজে'র বিষয়টিকে গভীর বিশ্লেষণ না করেই, হয় তাকে চোখ বন্ধ রেখে অন্ধভাবে 'প্রাসঙ্গিকতা' দিতে তৎপর হয়েছেন, নয়তো বা তা নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়া থেকে সচেতনভাবে বিরত থেকেছেন। আরো যেটা লক্ষণীয় তা হলো, বিজ্ঞজনদের মধ্যে একেক জন ‘সুশীল সমাজ' সম্পর্কে একেক রকম মনগড়া ধারণা নিয়ে অনেকটা অন্ধজনের মতো অগ্রসর হয়েছেন। হাল ফ্যাশনের বৈশ্বিক ভোকাবুলারিতে 'সিভিল সোসাইটি' অভিধাটি আন্তর্জাতিক সব উচ্চ মহলে বিশেষ জোরের সাথে পুনঃ পুনঃ উচ্চারিত হওয়ায়, তাদের অনেকেই পরিবর্তিত যুগের নতুন এই ফ্যাশনের কাছে বিনা প্রশ্নে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। একবারও তারা বেশির ভাগই নিজের মনের কাছেও এই প্রশ্নটি তোলেননি যে, ‘সিভিল সোসাইটি' বা 'সুশীল সমাজ' বিষয়টি আসলে কী?
‘সুশীল সমাজ’ অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘Civil Society' বলতে কী বোঝায় এবং কাদের নিয়ে তা গঠিত সে ধরনের প্রশ্নের কোনো স্বচ্ছ ও স্পষ্ট জবাব দিতে 'সুশীল সমাজ' হিসেবে আত্মপরিচয়দানকারীরা মোটেও রাজি হতে চান না। এই রহস্যের(!) পেছনে কারণ কি? এর পেছনে একটি প্রধান কারণ হলো, এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে গেলে যুক্তিতর্কের ফাঁদে পড়ে তারা নিজেরাও সংজ্ঞায়নের বিষয়ে একমত হতে পারবেন না এবং অন্যদেরকেও একমতে আনতে ব্যর্থ হবেন।
দেশের যেসব বিজ্ঞজন ‘সুশীল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments